বায়তুল্লাহর মুসাফির জানেন না, এই সফরেই হয়তো তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত আসবে। প্রতি বছর কিছু হাজি ও উমরাহযাত্রী পবিত্র ভূমিতেই আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন। পরিবারের জন্য এ সংবাদ বেদনার, তবে কোরআন ও হাদিসে এমন মৃত্যুর জন্য যে আশার বাণী আছে, তা শোকের মধ্যেও সান্ত্বনা দেয়।
হাজি ও উমরাহযাত্রী আল্লাহর মেহমান
নবী (সা.) বলেছেন: আল্লাহর মেহমান তিন দল — আল্লাহর পথে লড়াইকারী, হজ পালনকারী ও উমরাহ পালনকারী। (সুনানে নাসায়ি ২৬২৫)
মেজবান যেমন মেহমানের সম্মান রক্ষা করেন, তেমনি যিনি আল্লাহর ঘরের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছেন, তিনি মহান মেজবানের ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশা নিয়েই পথ চলেন।
নেক কাজের পথে মৃত্যু: প্রতিদান আল্লাহর জিম্মায়
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তারপর পথেই তার মৃত্যু হয়, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে যায়; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা নিসা, আয়াত ১০০)
আয়াতটি হিজরত প্রসঙ্গে নাজিল হলেও আলেমরা বলেন, এর শিক্ষা সব নেক সফরের ক্ষেত্রেই আশাব্যঞ্জক — আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বের হয়ে কাজ শেষ করার আগে মৃত্যু এলেও আন্তরিক নিয়ত ও চেষ্টা বৃথা যায় না।
তালবিয়া পড়তে পড়তে পুনরুত্থান
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, বিদায় হজে আরাফার ময়দানে এক সাহাবি বাহন থেকে পড়ে গিয়ে ইন্তেকাল করেন। নবী (সা.) নির্দেশ দিলেন: তাঁকে পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল দাও, তাঁর পরনের দুই কাপড়েই কাফন দাও, সুগন্ধি লাগিয়ো না এবং মাথা ঢেকো না; কারণ কিয়ামতের দিন তিনি তালবিয়া পড়তে পড়তে উঠবেন। (সহিহ বুখারি ১২৬৫; সহিহ মুসলিম ১২০৬)
ইবাদতরত অবস্থায় মৃত্যু এবং সেই অবস্থাতেই পুনরুত্থান — এর চেয়ে বড় সম্মান মুমিনের জন্য আর কী হতে পারে! (ইহরাম অবস্থায় মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের খুঁটিনাটি নিয়ে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ আছে; বাস্তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও দলের আলেমের নির্দেশনা অনুসরণ করা হয়।)
পথে মৃত্যুবরণকারীর জন্য সওয়াব লেখা হতে থাকে
নবী (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি হজ, উমরাহ বা আল্লাহর পথে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়ে পথে মারা যায়, আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য হাজি, উমরাহকারী ও গাজির সওয়াব লিখতে থাকেন। (বাইহাকি, শুআবুল ইমান)
কিছু মুহাদ্দিস এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আপত্তি করেছেন, তবে ফজিলতের আলোচনায় আলেমরা এটি উল্লেখ করেন। মূল কথা হলো, আল্লাহ কারও আন্তরিক আমল নষ্ট করেন না, আর চূড়ান্ত প্রতিদানের মালিক একমাত্র তিনিই।
পরিবার ও সফরসঙ্গীদের জন্য কয়েকটি কথা
- মক্কা বা মদিনায় কারও মৃত্যু হলে সাধারণত সেখানেই জানাজা ও দাফন হয় — মসজিদুল হারাম বা মসজিদে নববিতে জানাজার পর জান্নাতুল মুআল্লা বা জান্নাতুল বাকিতে।
- দলের মোয়াল্লেম, এজেন্সি ও বাংলাদেশ হজ অফিসকে দ্রুত জানান; মৃত্যুসনদ ও কাগজপত্রের কাজ তারাই এগিয়ে নেন।
- মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববিতে প্রায় প্রতি ওয়াক্তেই জানাজা হয় — জানাজার নামাজের নিয়ম জেনে রাখুন।
- যাঁর ওপর হজ ফরজ ছিল কিন্তু আদায়ের আগে মৃত্যু হয়েছে, তাঁর ব্যাপারে বদলি হজের বিধান আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।
জীবিতদের জন্য শিক্ষা
মৃত্যু কখন আসবে কেউ জানে না। তাই নেক কাজের নিয়ত করে তা ফেলে না রেখে যত দ্রুত সম্ভব পালন করা উচিত। আর হজ-উমরাহর প্রস্তুতি হওয়া চাই সব দিক থেকে — শারীরিক সামর্থ্য, হালাল অর্থ, ইবাদতের সঠিক জ্ঞান এবং আন্তরিক নিয়ত।
