হজ বা উমরাহর সফরে ইবাদতের ফাঁকে অনেকেই মক্কা ও মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখতে যান। এসব জায়গায় ইসলামের প্রথম দিনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে — ওহি নাজিলের পাহাড়, হিজরতের গুহা, প্রথম মসজিদ, বদর-উহুদের স্মৃতি। নিচে মক্কা ও হজের এলাকার ৮টি এবং মদিনার ৮টি স্থানের পরিচয় দেওয়া হলো।
মনে রাখবেন, হজের স্থানগুলো (মিনা, আরাফা, মুযদালিফা, জামারাত) ছাড়া অন্য স্থান দেখা হজ বা উমরাহর অংশ নয়। তাই ঘুরতে গিয়ে নামাজ বা হজের আমলে যেন ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
মক্কা ও হজের স্থান
১. মসজিদুল হারামالمسجد الحرام
কাবা শরিফকে ঘিরে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র মসজিদ।
কাবা শরিফ, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইবরাহিম, জমজম কূপ ও সাফা-মারওয়া এই মসজিদের ভেতরেই। উমরাহ ও হজের তাওয়াফ এবং সাঈ এখানেই করতে হয়। মাকামে ইবরাহিম, মুলতাজাম, হাতিম ও কাবার দিকে প্রথম দৃষ্টি পড়ার সময় — এগুলো দোয়া কবুলের স্থান হিসেবে পরিচিত।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →২. জাবালে নূর (হেরা গুহা)جبل النور
হেরা গুহা — যেখানে প্রথম ওহি নাজিল হয়।
এই পাহাড়ের চূড়ার কাছে হেরা গুহায় নবী মুহাম্মদ (সা.) ধ্যানমগ্ন থাকতেন এবং এখানেই তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। উমরাহর জিয়ারতে সাধারণত বাস থেকে পাহাড়টি দেখানো হয়।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৩. জাবালে সওরجبل ثور
হিজরতের সময় রাসুল (সা.) এখানে আশ্রয় নেন।
হিজরতের পথে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও আবু বকর (রা.) এই পাহাড়ের গুহায় তিন দিন আত্মগোপন করেছিলেন।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৪. জান্নাতুল মুআল্লাمقبرة المعلاة
মক্কার ঐতিহাসিক কবরস্থান।
উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা.)-সহ বহু সাহাবি ও রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের কবর এখানে রয়েছে।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৫. মিনাمنى
তাঁবুর শহর — হজের সময় এখানে অবস্থান।
৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত এবং ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ হাজিরা মিনার তাঁবুতে অবস্থান করেন। উমরাহর জিয়ারতে বাস থেকে দেখানো হয়।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৬. আরাফার ময়দান ও জাবালে রহমতعرفات · جبل الرحمة
উকুফে আরাফা — হজের প্রধান ফরজ।
৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা হজের ফরজ। ময়দানের মাঝে জাবালে রহমত — সম্ভব হলে এর কাছাকাছি অবস্থান করা উত্তম।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৭. মুযদালিফাمزدلفة
৯ জিলহজ দিবাগত রাত যাপনের স্থান।
আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর হাজিরা এখানে আসেন, মাগরিব ও এশা একসাথে আদায় করেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের আগে কিছু সময় এখানে অবস্থান করা ওয়াজিব। এখান থেকে কংকর সংগ্রহ করা হয়।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →৮. জামারাতالجمرات
তিন জামারায় কংকর নিক্ষেপের স্থান।
১০ জিলহজ বড় জামারায় (জামারাতুল আকাবা) ৭টি এবং ১১ ও ১২ জিলহজ তিন জামারায় ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করা হজের ওয়াজিব। নিক্ষিপ্ত কংকর জামারার বেষ্টনীর ভেতরে পড়া জরুরি।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →
মদিনা
৯. মসজিদে নববিالمسجد النبوي
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মসজিদ ও রওজা মোবারক।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক ও রিয়াজুল জান্নাহ এই মসজিদে। মসজিদে নববির ঐতিহাসিক স্তম্ভগুলোও (উসতুওয়ানা) দেখার মতো।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১০. মসজিদে কুবাمسجد قباء
ইসলামের প্রথম মসজিদ।
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় প্রবেশের আগে কুবায় অবস্থান করেন এবং এই মসজিদ নির্মাণ করেন। ঘর থেকে অজু করে এসে এখানে দুই রাকাত নামাজ পড়া ফজিলতপূর্ণ।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১১. মসজিদে কিবলাতাইনمسجد القبلتين
যেখানে নামাজের মধ্যে কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ আসে।
এই মসজিদে নামাজরত অবস্থায় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশ নাজিল হয় — তাই নাম "দুই কিবলার মসজিদ"।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১২. মসজিদে জুমুআمسجد الجمعة
যেখানে রাসুল (সা.) প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন।
হিজরতের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু সালেম গোত্রের মহল্লায় পৌঁছালে জুমার নামাজের ওয়াক্ত হয়; তিনি সেখানে প্রথম জুমার নামাজ কায়েম করেন। পরে সেখানে এই মসজিদ নির্মিত হয়। কুবা থেকে মদিনার পথে অবস্থিত।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১৩. মসজিদে গামামাহمسجد الغمامة
যেখানে ঈদের নামাজে মেঘ এসে রাসুল (সা.)-কে ছায়া দিয়েছিল।
গামামাহ শব্দের অর্থ মেঘখণ্ড। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ স্থানে ঈদের নামাজ পড়ানোর সময় একখণ্ড মেঘ এসে তাঁকে ছায়া দিত বলে বর্ণিত আছে। তিনি মাঝে মাঝে বৃষ্টি প্রার্থনার নামাজও এখানে আদায় করেছেন। পরে এখানে মসজিদ নির্মিত হয়।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১৪. জান্নাতুল বাকিالبقيع
মদিনার প্রধান কবরস্থান।
মসজিদে নববির পূর্ব পাশের এই কবরস্থানে বহু সাহাবি ও রাসুল (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের কবর রয়েছে।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১৫. উহুদ পাহাড়جبل أحد
উহুদ যুদ্ধের স্থান ও শুহাদায়ে উহুদ।
উহুদ যুদ্ধের প্রান্তর। হামজা (রা.)-সহ উহুদের শহীদদের কবর এখানে রয়েছে।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →১৬. খন্দক (সাত মসজিদ)المساجد السبعة
খন্দকের যুদ্ধের স্থান।
খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানরা এখানে পরিখা খনন করে মদিনা রক্ষা করেছিলেন। এলাকাটি সাত মসজিদ নামেও পরিচিত।
বিস্তারিত, ছবি ও মানচিত্র →
জিয়ারতের সময় যা মনে রাখবেন
- দর্শনীয় স্থানে যাওয়া সুন্নত বা ওয়াজিব আমল নয় — কেবল মসজিদে কুবায় নামাজ পড়ার আলাদা ফজিলত হাদিসে এসেছে।
- পাহাড়, দেয়াল বা কবরে হাত বুলিয়ে বরকত নেওয়া, সেখানে মানত করা বা কিছু ফেলে আসা থেকে বিরত থাকুন।
- কবরস্থানে গিয়ে সালাম দিন ও মৃতদের জন্য দোয়া করুন; কবরের কাছে নামাজ বা সিজদা করবেন না।
- গরমের দিনে সকাল বা বিকেলে যান, সঙ্গে পানি ও ছাতা রাখুন। জাবালে নূর ও জাবালে সওরে ওঠা কষ্টসাধ্য — বয়স্ক ও অসুস্থরা নিচ থেকেই দেখে নিন।
- দলের সাথে যান এবং ফেরার সময় ও হোটেলের ঠিকানা জেনে রাখুন।
প্রতিটি স্থানের মানচিত্র ও দিকনির্দেশনা দেখতে দর্শনীয় স্থান পাতায় যান। মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববির ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ইন্টারঅ্যাকটিভ নকশায় দেখে নিতে পারেন।
