অফিস: শনি–বৃহস্পতি, সকাল ১০টা – সন্ধ্যা ৭টা

হজের মৌলিক বিষয়: শর্ত, প্রকার, ফরজ-ওয়াজিব-সুন্নত

পড়তে সময় লাগবে: ৮ মিনিট সর্বশেষ হালনাগাদ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬

হজের আভিধানিক অর্থ সংকল্প করা। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ৮ থেকে ১২ জিলহজ বায়তুল্লাহ, মিনা, আরাফা, মুযদালিফা, জামারাত ও সাফা-মারওয়ায় শরিয়ত নির্দেশিত বিধানগুলো পালন করাকে হজ বলে। সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ।

হজ ফরজ হওয়ার শর্ত

  • মুসলমান হওয়া।
  • স্বাধীন হওয়া।
  • বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) হওয়া।
  • শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ ও সক্ষম হওয়া।
  • আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া — যাতায়াত, থাকা-খাওয়া এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা থাকা।

নারীদের জন্য: শরিয়াহর বিধান অনুসারে নারীদের হজের সফরে স্বামী বা মাহরাম সফরসঙ্গী থাকা আবশ্যক।

হজ ফরজ হওয়ার পর দরিদ্র হয়ে পড়লেও ফরজ রহিত হয় না। শারীরিকভাবে অক্ষম হলে, পথ নিরাপদ না হলে বা নারী মাহরাম না পেলে অপেক্ষা করবেন; প্রয়োজনে বদলি হজ করাবেন।

হজের ফজিলত

  • আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং হজের সময় অশালীন কথা-কাজ ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো। (বুখারি ১৫২১, মুসলিম ১৩৫০)
  • রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: মাবরুর বা মকবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। (বুখারি ১৭৭৩, মুসলিম ১৩৪৯)

হজের প্রকার

  1. ইফরাদ: হজের মাসে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম করে হজ পালন। এতে তাওয়াফে কুদুম সুন্নত, কুরবানি ঐচ্ছিক।
  2. তামাত্তু: হজের মাসে প্রথমে শুধু উমরাহর নিয়তে ইহরাম করে উমরাহ পালন, পরে হজের নিয়তে আবার ইহরাম করে হজ পালন। কুরবানি ওয়াজিব। উমরাহ করে হালাল হওয়ার পর হজের ইহরামের আগে বারবার উমরাহ করা সুন্নতের খেলাপ।
  3. কিরান: একই ইহরামে হজ ও উমরাহ দুটোরই নিয়ত করে উমরাহর পর হালাল না হয়ে হজ সম্পন্ন করা। কুরবানি ওয়াজিব।

তাওয়াফে কুদুম: ইফরাদ হাজি মক্কায় এসে প্রথম যে তাওয়াফ করেন এবং কিরান হাজি উমরাহর তাওয়াফ ও সাঈর পর আবার যে তাওয়াফ করেন — তাকে তাওয়াফে কুদুম বলে।

হজের নিয়ত

ইফরাদ ও তামাত্তু:

اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أُرِيْدُ الْحَجَّ فَيَسِّرْهُ لِيْ وَتَقَبَّلْهُ مِنِّيْ

আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ফাইয়াসসিরহু লি ওয়া তাকাব্বালহু মিন্নি। — হে আল্লাহ, আমি হজ পালনের নিয়ত করছি; আপনি তা আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।

কিরান:

اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أُرِيْدُ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ فَيَسِّرْهُمَا لِيْ وَتَقَبَّلْهُمَا مِنِّيْ

আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ওয়াল উমরাতা ফাইয়াসসিরহুমা লি ওয়া তাকাব্বালহুমা মিন্নি। — হে আল্লাহ, আমি হজ ও উমরাহ পালনের নিয়ত করছি; আপনি উভয় আমল আমার জন্য সহজ করে দিন এবং কবুল করে নিন।

হজের ফরজ ৩টি

  1. ইহরাম করা।
  2. উকুফে আরাফা — সূর্য পশ্চিমে হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কিছু সময় আরাফায় অবস্থান (পূর্ণ সময় অবস্থান ওয়াজিব)। বিশেষ ওজরে ৯ জিলহজ দিবাগত রাতের সুবহে সাদিকের আগে কিছু সময় অবস্থান করলেও ফরজ আদায় হবে।
  3. তাওয়াফে যিয়ারাহ (ফরজ তাওয়াফ)।

হজের ওয়াজিব ৬টি

  1. ৯ জিলহজ দিবাগত রাতে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয়ের মধ্যে কিছু সময় মুযদালিফায় অবস্থান।
  2. ১০ জিলহজ বড় জামারায় ৭টি এবং ১১ ও ১২ জিলহজ তিন জামারায় ৭টি করে মোট ৪৯টি কংকর নিক্ষেপ। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করা সম্ভব না হলে ১৩ জিলহজ আরও ২১টি।
  3. কিরান ও তামাত্তু হজে দমে শোকর বা কুরবানি।
  4. হলক বা কসর — পুরুষের মাথা মুণ্ডানো (উত্তম) বা চুল ছোট করা; নারীর চুলের অগ্রভাগ থেকে আঙুলের এক কর পরিমাণ কাটা।
  5. সাফা-মারওয়ায় সাঈ।
  6. মিকাতের বাইরে থেকে আগতদের বিদায়ী তাওয়াফ।

কোনো ওয়াজিব ছুটে গেলে দম দেওয়া ওয়াজিব। ১০ জিলহজের আমলের (বড় জামারায় কংকর, কুরবানি ও হলক) ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও ওয়াজিব।

হজের সুন্নতসমূহ

  • ইহরামের আগে গোসল করা।
  • পুরুষের সাদা রঙের ইহরামের কাপড় পরা।
  • বেশি বেশি তালবিয়া পড়া।
  • ইফরাদ ও কিরান হাজির তাওয়াফে কুদুম করা।
  • ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করা।
  • ৮, ১০ ও ১১ জিলহজ দিবাগত রাতে মিনায় রাত্রিযাপন।
  • ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা থেকে আরাফায় যাওয়া।
  • উকুফে আরাফার জন্য গোসল করা।
  • সুবহে সাদিকের আগে পর্যন্ত মুযদালিফায় অবস্থান করা।
  • ছোট ও মধ্যম জামারায় কংকর নিক্ষেপের পর দোয়া করা।
  • যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে, তাতে পুরুষের প্রথম তিন চক্করে রমল ও ইজতিবা করা।
  • সাফা-মারওয়ার সবুজ চিহ্নিত অংশে পুরুষের দৌড়ে চলা; নারীর স্বাভাবিক গতিতে চলা।

৭ ও ১৩ জিলহজ

৭ জিলহজ জোহরের পর কাবা শরিফে ইমামুল হজ প্রথম খুতবা দেন, যাতে হজের বিধান ও পাঁচ দিনের কর্মসূচি বলা হয় — সম্ভব হলে শুনুন। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ করতে না পারলে ১৩ জিলহজ সূর্য হেলে যাওয়ার পর তিন জামারায় ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করে মক্কায় ফিরবেন।

কিরান ও ইফরাদ হজের ধাপ

তামাত্তু হজের দিনভিত্তিক ধাপ হজের দিনগুলো গাইডে আছে। কিরান হজে একই ইহরামে উমরাহর তাওয়াফ ও সাঈ করে হালাল না হয়ে থাকতে হয়, তারপর হজের বাকি আমল তামাত্তুর মতো। ইফরাদ হজে শুধু হজের ইহরাম; কুরবানি ওয়াজিব নয়, তাই কংকর নিক্ষেপের পর সরাসরি হলক করা যায়। বদলি হজ সাধারণত ইফরাদ হজ হিসেবে করা হয়।

সূত্র: হজ ও উমরাহ সহায়িকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় (২০২৪)।